মো:আল-আমিন
সাভারে কর্মরত একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সাংবাদিকের সঙ্গে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনাটি নিছক একটি হামলার চেষ্টা বা বিচ্ছিন্ন অঘটন নয়; বরং এটি বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ভেতরকার এক গভীর, পচনশীল বাস্তবতাকে নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে।
এই ঘটনা প্রমাণ করে, যখন একজন মফস্বল সাংবাদিক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুর্নীতির অন্ধকার গহ্বর থেকে সত্য তুলে আনেন, তখন সেই সত্যই ঢাকার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কাঁচঘেরা অফিসে বসে প্রভাবশালীদের সাথে দরকষাকষি বা ‘নেগোসিয়েশনের’ পণ্য হয়ে যায়। প্রশ্ন ওঠে, আমরা আসলে কোন সাংবাদিকতার চর্চা করছি?
অনুসন্ধানে উঠে এসেছিল, সাভারের সাব-রেজিস্ট্রার জাকির হোসেন শুধু ছাত্রলীগী ব্যাকগ্রাউন্ডের কারণেই সুবিধাপ্রাপ্ত নন, তিনি জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার হত্যা মামলারও আসামি। দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তৈরি প্রতিবেদনটি প্রচারের পর, রহস্যজনকভাবে সেটি সরিয়ে ফেলা হয়। অভিযোগ রয়েছে, কেন্দ্রীয় অফিসই অভিযুক্তের সঙ্গে আপস করে ওই সৎ ও সাহসী প্রতিনিধিকে চাকরিচ্যুত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এটি শুধু একটি অনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়—এটি সাংবাদিকতার আত্মাকে বিকিয়ে দেওয়া এবং সত্যের সাথে চূড়ান্ত বিশ্বাসঘাতকতা। যখন সংবাদমাধ্যম নিজেই অপরাধীর ঢাল হিসেবে দাঁড়ায়, তখন ‘গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ’ কথাটি স্রেফ প্রহসনে পরিণত হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সংবাদটি সরিয়ে নেওয়ার পর অভিযুক্ত ব্যক্তি এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন যে, তিনি আজ প্রকাশ্যে ওই সাংবাদিককে অপহরণের হুমকি দেওয়ার এবং তুলে নিয়ে যাওয়ার সাহস দেখিয়েছেন। অর্থাৎ, একটি সংবাদকে চেপে যাওয়ার সিদ্ধান্ত শুধু সত্যকে হত্যা করেনি, বরং একজন সাহসী সংবাদকর্মীকে সরাসরি মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। নিজের প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকেই যখন বিশ্বাসঘাতকতা আসে, তখন মাঠের সাংবাদিকের সুরক্ষার আর কোনো জায়গা থাকে না।
ঢাকার কর্পোরেট অফিসগুলোতে বসে যারা নীতির বুলি আওড়ান, তাদের কাছে কি মাঠের সাংবাদিকদের জীবন এতটাই তুচ্ছ? একটি বিজ্ঞাপন, একটি গোপন সমঝোতা বা রাজনৈতিক আনুকূল্য—এই কি আজকের গণমাধ্যমের নৈতিকতার মানদণ্ড? আজকের এই ভয়াবহ বাস্তবতার পেছনে তিনটি অপশক্তি সরাসরি দায়ী: একশ্রেণীর গণমাধ্যম মালিক ও নীতিনির্ধারক যারা সাংবাদিকতাকে মুনাফা ও ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করছেন; দুর্নীতিগ্রস্ত আমলাতন্ত্র যারা ক্ষমতার দম্ভে সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য পণ্য মনে করছে; এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর রহস্যজনক নীরবতা যা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে আরও গভীর করছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো—বাংলাদেশের সমগ্র সাংবাদিক সমাজের ইস্পাতকঠিন ঐক্য। রাজনৈতিক আনুগত্যের গণ্ডি পেরিয়ে একটি শক্তিশালী, স্বাধীন এবং জবাবদিহিমূলক সাংবাদিক ইউনিয়ন গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। কারণ, মফস্বল সাংবাদিকরা কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রান্তিক কর্মী নন; তারা সেই প্রতিষ্ঠানের প্রাণস্পন্দন, জনমানুষের কণ্ঠস্বর। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে, গণমাধ্যম নিজের অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে এবং জনতার আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াবে।
‘দৈনিক ভোরের হাওয়া’ বরাবরের মতোই দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন এবং মাঠের সাহসী সংবাদকর্মীদের পাশে থাকবে। আমরা সাভারের ওই সহকর্মীর ওপর হামলার চেষ্টার তীব্র নিন্দা জানাই এবং সংশ্লিষ্ট সকল গণমাধ্যমের প্রতি স্পষ্ট বার্তা দিতে চাই—স্বার্থের বিনিময়ে সত্য বিক্রি বন্ধ করুন, সহকর্মীদের বিপদে ঠেলে দেবেন না। অন্যথায়, জনমনে গণমাধ্যমের যে টুকু আস্থা অবশিষ্ট আছে, তাও অচিরেই বিলীন হয়ে যাবে।
লিখেছেন:মো: আল-আমিন
নির্বাহী সম্পাদক,দৈনিক ভোরের হাওয়া
Leave a Reply